প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো হাওড়ার ভাই খাঁ পীরের মেলা


দিন দর্পণ, হাওড়াঃ আগামীকাল মাঘ মাসের পয়লা তারিখ।কলকাতার পাশের জেলা হাওড়ায় এই দিন বছরে মাত্র একদিনের জন্য উদয়নারায়ণপুরের সিংটি গ্রামে ভাই খাঁয়ের উরুষ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলাটি হাওড়া জেলার সর্বপ্রাচীন মেলা।এই মেলা অন্তত ৫০০ বছরের অধিক পুরনো।সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক আশ্চর্য বাতাবরণ গড়ে ওঠে এই মেলাকে ঘিরে।তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের সংস্কৃতি।ধর্ম জাত নির্বিশেষে এই মেলায় ভিড় করেন মানুষে।পশ্চিমবঙ্গে অন্যান্য যেসব জেলায় লোক উৎসব  সংগঠিত হয়ে থাকে, লোক সমাগমের দিক থেকে সাগর মেলার পরেই সিংটির এই মেলার স্থান দ্বিতীয়।এই মেলায় লক্ষাধিক মানুষ ভিড় করেন।এই মেলার ভিড়ের মধ্যেই ভাই খাঁ পীরের মাজার শরীফে গেলে দেখবেন কত পুণ্যার্থী তাদের মনোবাসনা পূরণের জন্য ফুল সিন্নি দুধ দিচ্ছে ভক্তি ভরে।আবার কোন কোন রমণী পীর পুকুরে সিক্ত বসনে গলবস্ত্র হয়ে এক মনে ফুল ভাসিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনোকামনা পূরণের জন্য।

ভাই খাঁ পীরের মেলার মূল আকর্ষণ নতুন মাঠের ওঠা আলুর দম, ঝুড়ি ঝুড়ি সামুদ্রিক কাঁকড়া এবং গ্রামীণ জীবনের চাহিদা অনুযায়ী লোকশিল্প। সুন্দরবন, ক্যানিং, হাসনাবাদ এবং কাকদ্বীপ থেকে অন্তত ৩০০-৪০০ জন পাইকারি কাঁকড়া-বিক্রেতা তাদের বিভিন্ন আকারের কাঁকড়া নিয়ে মেলায় আসেন।আশেপাশের গ্রামবাসীদের সাথে দূর দূরান্ত থেকে মানুষজন এই একদিন ভিড় করেন মেলায়।ছোট চিতা কাঁকড়া থেকে শুরু করে দৈত্যাকার কাঁকড়া।ছোট কাঁকড়াগুলি প্রতি কেজি ৩০০-৪০০ টাকা, মাঝারি আকারের প্রতি কেজি ৬০০-১০০০ টাকা এবং দৈত্যাকার কাঁকড়া প্রতি কেজি ২০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

নতুন ধানের সাথে এই সময় হাওড়ার উদয়নারায়নপুর এলাকায় নতুন আলু ওঠে।তাই এই মেলার আরেক বিশেষ আকর্ষণ আলুরদম। পয়লা মাঘে সিংটিতে একটা গোটা মাঠ জুড়ে আলুর দমের মেলা হয়।প্রায় শ’খানেক মানুষ মাঠের নানা জায়গায় কাঠকুটো বা স্টোভ জ্বালিয়ে আলুর দম রাঁধেন।বড় বড় হাঁড়িতে বগবগ করে ফুটছে আলুর ঝোল।আর ঘরে বসে সারাদিন ধরে হাজার হাজার মানুষ সপরিবারে কলাপাতায় আলুর দম দিয়ে মুড়ি মেখে খাচ্ছেন।আলুর দম এখানে ওজনে বিক্রি হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই মেলার পিছনে এক কিংবদন্তী ইতিহাস আছে।কিছু সত্যি আর কিছুটা কল্পনা মিশ্রিত যে কাহিনী প্রচলিত আছে তা হল সাতশো বছর আগে আরব দেশ থেকে ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এই হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের সিংটি গ্রামে আসেন এক মুসলমান পীর।তিনি এই গ্রামে বাসা বেঁধে বাস করতে শুরু করেন।তাঁর আসল নাম কেউই জানত না।কিন্তু ছোট ছেলেদের তিনি ভারি স্নেহ করতেন এবং তাঁকে ছোট ছেলেরা ভাই খাঁ বলে ডাকত।সেই থেকে গ্রামবাসীরা সেই নামেই তাঁকে ডাকতে শুরু করল।তাঁর কিছু অলৌকিক ক্ষমতার কারণে মানুষ জন তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত এবং ভাই খাঁ পীর নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।এই ভাই খাঁ পীর পরলোকগমন করেছিলেন তিরিশে পৌষ এবং তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল তার পরের দিন।সেদিন নাকি লক্ষাধিক মানুষ এসেছিলেন তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে।মাঘ মাসের প্রথম দিন ছিল সেই দিনটি।অত মানুষ আসায় সেখানে নাকি একটা মেলা বসে গিয়েছিল।তখন থেকেই প্রত্যেক বছর এই ভাই খাঁ পীরের সমাধি দিবসে তাঁর নামেই এই মেলা বসে।এই মেলায় যাওয়ার জন্য হাওড়া স্টেশন থেকে উদয়নারায়নপুর বা রামপুর গামী যেকোন বাসে সিংটি স্টপেজে নেমে মিনিট ১০-১৫ হাঁটলেই এই আলুরদম ও কাঁকড়ার মেলায় যাওয়া যাবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *