দিন দর্পণ প্রতিবেদন: ঘরবসতির একটা নিজস্ব ভাষা থাকে। সেখানে লেগে থাকে শৈশবের ধুলোবালি, তুলসী তলার প্রদীপের আলো, আর বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা উৎসব-পার্বণের আনন্দ। কিন্তু গত দুই বছরে বাংলাদেশের অনেক সংখ্যালঘু পরিবারের কাছে সেই চেনা ঘরবসতিই হঠাৎ করে এক অজানা আতঙ্কের চাদরে ঢাকা পড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের রাত থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের এই আগস্ট পর্যন্ত—বিগত দুই বছরের দিনলিপিতে যুক্ত হয়েছে অনেকগুলো দীর্ঘশ্বাস, চোখের জল আর হারিয়ে যাওয়া স্বজনের স্মৃতি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল এ দেশের সব ধর্মের মানুষের এক হওয়ার যৌথ লড়াই। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশকে স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন। হিন্দু সম্প্রদায়ও সেই যুদ্ধে অকাতরে রক্ত দিয়েছিল।
কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, একাত্তরের পর থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের কারণে লক্ষ লক্ষ হিন্দু পরিবারকে নিঃশব্দে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, দেশভাগের সময় বা একাত্তরের পর থেকে এ দেশে সংখ্যালঘু জনসংখ্যার শতকরা হার ক্রমাগত কমেছে। এই পদাঙ্ক অনুসরণ করে গত দুই বছরেও অনেক পরিবার দেশ ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এই চলে যাওয়া কেবল এক একটি মানুষের স্থানান্তর নয়, এটি বাংলাদেশ থেকে তার হাজার বছরের পুরোনো সংস্কৃতির এক একটি অংশ চিরতরে হারিয়ে যাওয়া।
বিগত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলা হয়েছে, তাদের ক্ষতের গল্পগুলো প্রায় একই রকম। কোনো কোনো এলাকায় সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধের চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তার জীবনের শেষ সম্বলটুকু। কোথাও আবার উৎসবের আলো ছড়ানোর আগেই ভাঙচুর করা হয়েছে দেবীর প্রতিমা। এই সহিংসতা শুধু ইট-পাথরের ঘর ভাঙেনি, ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে মানুষের ভেতরের চিরন্তন বিশ্বাসকে। নিজের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে যখন একজন মানুষকে তার নিরাপত্তার জন্য আকুতি জানাতে হয়, তখন সেই কান্নার কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম থাকে না; তা হয়ে ওঠে মানবাতার এক চরম পরাজয়।
কেন বারবার এই চেনা প্রতিবেশীরাই ভাঙনের শিকার হন? সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের বৈরী আবহাওয়ায় সংখ্যালঘুরা সবসময়ই এক সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছেন। স্থানীয় কোন্দল, জমি-জমা সংক্রান্ত লোভ কিংবা স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে বারবার আঘাত করা হয়েছে এমন কিছু মানুষকে, যারা শান্তিতে বাঁচতে চান। এর সাথে যোগ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তৈরি করা কৃত্রিম গুজব। একটি ভুয়া পোস্ট বা একটি উসকানিমূলক মিথ্যা খবর মুহূর্তের মধ্যে ছাই করে দিয়েছে যুগের পর যুগ ধরে পাশাপাশি থাকা দুটি পরিবারের বিশ্বাস।
দীপু দাস থেকে রংপুরের গণপতি চক্রবর্তী
বিগত দুই বছরের এই করাল গ্রাসে কেবল ঘরবাড়ি বা সহায়-সম্বলই পুড়েনি, ঝরে গেছে বহু অমূল্য প্রাণ, স্তব্ধ হয়ে গেছে কত চেনা হাসিমুখ। পরিসংখ্যানের খটখটে সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেইসব রক্তাক্ত মানুষের গল্পগুলো প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে কাঁদিয়ে যায়। ময়মনসিংহের ভালুকায় পিটিয়ে ও পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল ২৮ বছরের সাধারণ পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে। মাত্র তিন বছরের কন্যাসন্তানের এই বাবার অপরাধ ছিল স্রেফ এক অন্ধ গুজবের বলি হওয়া। দীপুর সেই ছোট্ট মেয়ের অবুঝ চোখ দুটো আজো হয়তো তার বাবার ফেরার পথ চেয়ে থাকে, কিন্তু যে বাবা এক পৈশাচিক উন্মাদনার শিকার হয়ে চিরতরে হারিয়ে গেছেন, তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।
এই নিষ্ঠুরতার ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছে আজকের রংপুরের সেই নিথর হয়ে যাওয়া বাড়িটির গল্প। রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, সদ্য মাস্টার্স শেষ করা স্বপ্নাতুর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া ছোট্ট ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী—একই রাতে একটি পুরো পরিবারকে শ্বাসরোধ করে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হলো! যে শিক্ষক সারাজীবন আলো ছড়িয়েছেন, তার নিজের নতুন তৈরি করা বাড়িটিই হয়ে উঠলো এক নারকীয় অন্ধকার মৃত্যুর কূপ। ছাদ থেকে শুরু করে সিঁড়ি ঘর, আর বিছানার নিচে পড়ে থাকা এক একটি রক্তাক্ত ও নিথর দেহ যেন এ দেশের সংখ্যালঘু জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতার এক একটি জীবন্ত দলিল। দীপু দাস থেকে শুরু করে রংপুরের এই শিক্ষক পরিবার—এই নামগুলো কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধের শিকার নয়, এরা আমাদের সামগ্রিক মানবিকতা ও সামাজিক সুরক্ষার পরাজয়ের প্রতীক।
বিগত দুই বছরের ক্ষত আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়… শুধু মুখের কথায় বা সান্ত্বনায় এই ভীতি দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। জখম হওয়া হৃদয়গুলোকে সারিয়ে তুলতে হলে আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি সামাজিক মেলবন্ধনকে আরও জোরদার করতে হবে।
সবুজ এই মানচিত্রে একই সাথে আজানের ধ্বনি আর শঙ্খধ্বনি যুগ যুগ ধরে মিশে আছে। এই বৈচিত্র্যই আমাদের সৌন্দর্য, আমাদের অহংকার। ২০২৬ সালের এই আগস্টে দাঁড়িয়ে আমাদের শপথ হোক—আর কোনো প্রতিবেশীর চোখ যেন ভিটেমাটি হারানোর ভয়ে অশ্রুসজল না হয়। এক আকাশের নিচে, এক মাটিতে আমরা সবাই যেন বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, “এই দেশ আমার, এই দেশ আপনার।”
