হাজি মহসিনের কর্ম তাঁকে ২০০ বছর বাঁচিয়ে রেখেছে/বিত্ত নিগমের অনুষ্ঠানে বললেন পিবি সেলিম


মিজানুর রহমান ও কল্যাণ অধিকারী, দিন দর্পণ : ‘দানবীর’ হাজি মুহাম্মদ মহসিন তাঁর জীবনকালে বহু সমাজসেবা, ধর্মীয় পরিষেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজ করে গিয়েছেন। অবিভক্ত বাংলায় শিক্ষা বিস্তারে তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। সমাজকল্যাণে তিনি অকাতরে বিলিয়েছেন তাঁর ধন-সম্পদ। সেই হাজি মুহাম্মদ মহসিনের ফান্ডের টাকা থেকেই রাজ্যের মাধ্যমিক, হাই মাদ্রাসা ও আলিমের ১০০ জন কৃতী সংখ্যালঘু পড়ুয়াকে বৃত্তি প্রদান করা হল।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন রকমের বৃত্তি প্রদান করে থাকে পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম। ঐক্যশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৪৫ লক্ষের বেশি পড়ুয়াকে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের মাধ্যমেই প্রত্যেক বছর পয়লা আগস্ট হাজি মুহাম্মদ মহসিন এনডাওমেন্ট ফান্ড থেকে রাজ্যের কৃতি পড়ুয়াদের বৃত্তি প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রসঙ্গত, এদিনই মুহাম্মদ মহসিনের নামে হুগলিতে মহসিন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই মেধাবী পড়ুয়াদের বৃত্তি প্রদানের জন্য প্রত্যেক বছর এদিনটিকেই বেছে নেওয়া হয়।

এবছর নিউটাউনে নজরুল তীর্থে বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কৃতী পড়ুয়াদের বৃত্তি প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী, শিক্ষাবিদ, সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের আধিকারিক থেকে শুরু করে রাজ্য সরকারের সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের কর্তারা। 

এদিনের অনুষ্ঠানের শুরুতেই সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের কাজ সম্পর্কে জনসমক্ষে বিস্তারিত তুলে ধরেন সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের সচিব পি বি সেলিম। পাশাপাশি তিনি ‘দানবীর’ হাজি মুহাম্মদ মহসিনের জীবনী সম্পর্কেও বত্তৃ«তা রাখেন। হাজি মুহাম্মদ মহসিনকে স্মরণ করে কৃতীদের উদ্দশ্যে সেলিম বলেন, ‘হাজি মুহাম্মদ মহসিন জনকল্যাণের জন্য এমন কাজ করে গিয়েছেন, যার জন্য তাঁর মৃত্যুর ২০০ বছর পরেও মানুষ তাঁকে মনে রেখেছেন। আমাদের জীবনকে এমনভাবে সাজিয়ে তুলতে হবে অন্ততপক্ষে মানুষ আমাদের মৃত্যুর কমপক্ষে কুড়ি বছর পর পর্যন্ত যেন আমাদের কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে সেলিম পড়ুয়াদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ছাড়াও প্রশাসনিক কিংবা জুডিশিয়াল ক্ষেত্রে এগিয়ে আসার জন্য উৎসাহিত করার পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার পরামর্শ দেন। বলেন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়তো অনেকেই হতে পারবেন। কিন্তু হাজি মুহাম্মদ মহসিনদের মতো ভালো মানুষ হতে সবাই পারেন না। কিন্তু সমাজে একজন ভালো মানুষ সবার আগে প্রয়োজন। তা না হলে কোনও সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, আল আমীন মিশনের কর্ণধার এম নুরুল ইসলাম। কৃতী পড়ুয়ারা কীভাবে আগামী দিনে সাফল্য অর্জন করবেন, সে বিষয়ে দিশা দেখান তিনি। বলেন, হাজি মুহাম্মদ মহসিনের ফান্ড থেকে কৃতী পড়ুয়ারা ২০ হাজার টাকা করে বৃত্তি পাচ্ছেন। টাকার হিসাবে যা খুব বড় বিষয় নয়। কিন্তু হাজি মুহাম্মদ মহসিনের নামে এই বৃত্তি তাঁরা পাচ্ছেন, সেটাই বড় বিষয়। কারণ, পড়ুয়াদের মনে প্রভাব পড়বে যে, যাঁর নামে এই বৃত্তি পেয়েছি, আমাকেও তাঁর মতো হতে হবে। যাতে আমি চলে গেলেও আমাকে সারা পৃথিবীর মানুষ মনে রাখবে আমাকে। পড়ুয়াদের উৎসাহিত করে নুরুল ইসলাম আরও বলেন, যারা এই বৃত্তি পেয়েছ,আল্লাহ্পাক তাঁদের স্পেশালভাবে সৃষ্টি করেছেন। কারণ দশ লক্ষ পড়ুয়ার মধ্যে তোমরা প্রথম সারিতে রয়েছ। তোমাদের মধ্যে অনেকেই বিজ্ঞানী হবে, যাদের গবেষণার সুফল শুধু রাজ্য কিংবা দেশ নয়, সারা পৃথিবীর মানুষ পাবেন। পড়ুয়াদের সেই স্বপ্ন দেখেই এখন থেকে এগিয়ে যেতে হবে।

অন্যদিকে, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে মুহাম্মদ মহসিনের ভূমিকা তুলে ধরেন মন্ত্রী মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ্ চৌধুরী।

প্রসঙ্গত, হাজি মুহাম্মদ মহসিনের কিছু অর্থ রিজার্ভ ব্যাঙ্কে গচ্ছিত ছিল। তাকেই বলা হয় মহসিন ফান্ড বা হাজি মুহাম্মদ মহসিন এনডাওমেন্ট ফান্ড। স্বাধীনতার পর বহুদিন এই অর্থ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়েছিল। রাজ্যে দীর্ঘদিন কংগ্রেস কিংবা ৩৪ বছর ধরে বামেরা ক্ষমতায় থাকলেও সেই অর্থ সামাজিক কাজে ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদল ঘটে। ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম এই ফান্ডের অর্থ থেকেই ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর মাধ্যমিক, হাই মাদ্রাসা ও আলিমে সেরা ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপ দিচ্ছে। এবছর মাধ্যমিকের ৭০, হাই মাদ্রাসার ২০ ও আলিমের ১০ জন কৃতী পড়ুয়াকে এই বৃত্তি প্রদান করা হয়।

প্রসঙ্গত, শুধু পড়ুয়াদের বৃত্তি প্রদানই নয়, এছাড়া সংখ্যালঘু উন্নয়নে আরও অনেক কাজ করে থাকে সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম। বেকার ছেলে মেয়েদের সম্পূর্ণ নিখরচায় ডব্লিউবিসিএস, আইএএস, আইপিএস, পুলিশ সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশিক্ষণ দেয় বিত্ত নিগম। পাশাপাশি বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কোর্সেও সম্পূর্ণ নিখরচায় প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে বিত্ত নিগম। আবার স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে বেকারদের ঋণ প্রদানও করে থাকে সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের অধীনস্থ এই সংস্থাটি।

এ দিনের অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের প্রতিমন্ত্রী তাজমুল হোসেন, বিশেষ সচিব সাকিল আহমেদ, সচিব ওবাইদুর রহমান, মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের সভাপতি আবুতাহের কামরুদ্দিন সহ বিশিষ্টরা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *