মিজানুর রহমান, দিন দর্পণ, 21 জুলাইঃ ছাব্বিশের বিধানসভার সুর একুশের জনসভা থেকে বেঁধে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার ধর্মতলায় একুশের জনসমুদ্র থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসঙ্গে বাম-বিজেপিকে বি¥ধেছেন। তবে এবার শ্লোগান অনেকটাই বলতে দিয়েছেন। বলেছেন, বদলা নয়, জব্দ করো, স্তব্ধ করো। কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুর্গাপুরের জনসভা থেকে বদলের যে ডাক দিয়েছিলেন এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার পাল্টা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলায় বদলের কথা বলছেন, এই বদল দিল্লিতে হবে না তো? তারপরই তিনি বলেন, ছাব্বিশে বাংলায় রেকর্ড ব্যবধানে জিতবে তৃণমূল কংগ্রেস। তারপরই দিল্লি দখল করবে। দিল্লি থেকে বিজেপিকে উৎখাত না করার পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন থামবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘এই একুশের মঞ্চ থেকে দিল্লিতে সরকার উৎখাত করার শিলান্যাস করলাম।’ তাঁর কথায়, ‘২০২৬ শুধু বিধানসভা নির্বাচন নয়, এই ভোট দিল্লির দখলের প্রস্তুতি।’
ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে একুশের সমাবেশ মঞ্চ থেকে কেন্দ্র ও বিজেপিকে একের পর এক আক্রমণে বিদ্ধ করলেন তৃণমূল নেত্রী। প্রতিবাদের পাশাপাশি এদিন তাঁর বার্তায় ছিল পরবর্তী রাজনৈতিক লড়াইয়ের নীল নকশা কর্মীদের এঁকে দেওয়া। তৃণমূলের লড়াইকে দিল্লি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে নই। আমি যা শুরু করি, তা শেষ না করে ছাড়ি না। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম মনে আছে তো? দরকারে বাঙালি হেনস্তার বিরুদ্ধে আন্দোলন দিল্লি নিয়ে যাব। দরকারে আবার ভাষা আন্দোলন শুরু হবে।’
মমতার কথায়, ‘বাংলার সম্মান, সংস্কৃতি ও ভাষার উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে এবার লড়াই শুধু কলকাতার রাজপথে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা পৌঁছবে দেশের রাজধানীতেও। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন একযোগে বাংলার নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত করছে। ভোটার তালিকা থেকে যদি একজনের নামও বাদ যায়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের অফিস ঘেরাও করা হবে। এটা বাংলার মানুষ মেনে নেবে না।’
কেন্দ্রের সরকার বেকারত্ব দূর করতে না-পারলেও তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে রাজ্যে বেকারত্ব কমেছে বলে এদিন দাবি করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে ৪০ শতাংশ বেকারত্ব কমেছে। এটা বাংলার মানুষের গর্ব। বিজেপি বলেছিল, বছরে ২ কোটি চাকরি দেবে। কিন্তু সেটা তারা করতে পারেনি। রাজ্য সরকারের ৯৪টি সামাজিক প্রকল্প আছে। আট কোটিরও বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসাথীর আওতায়, ২ কোটি মানুষকে দারিদ্রসীমার উপর তোলা হয়েছে, ৭৭ লক্ষ জবকার্ডধারী কাজ পেয়েছেন, আর ১২ লক্ষ সেলফ হেল্প গ্রুপ বাংলাকে আত্মনির্ভরতার মডেলে রূপান্তর করেছে।’ তাঁর কথায়, ‘বাংলার প্রতিটি উন্নয়নের পিছনে রয়েছে সাধারণ মানুষের ঘাম-রক্ত, সেই গর্ব নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বিজেপির মিথ্যে প্রচারে কেউ ভুলবে না।’
এবারের নির্বাচনে বাঙালি অস্মিতাকে তিনি যে রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে চলেছেন তাও এদিন স্পষ্ট করে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপিকে বাংলা বিরোধী আখ্যা দিয়ে যেমন তীব্র আক্রমণ করেছেন, তেমনই হুঙ্কার ছেড়েছেন, ‘বাংলা ভাষার উপরে চলা সন্ত্রাস বন্ধ না হলে ফের ভাষা আন্দোলনে নামবেন।’ এর পরেই তিনি ঘোষণা করেন, ‘আগামী ২৭ জুলাই নানুর দিবস থেকে প্রতি শনি ও রবিবার বাংলা ভাষার উপর আক্রমণের প্রতিবাদে মিটিং-মিছিল করবে তাঁর দল। বিধানসভা ভোটের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন চলবে।’
মমতা বলেন, ‘বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালাচ্ছে বিজেপি। বাংলায় কথা বলা বাংলাভাষীদের উপরে নির্যাতন নামিয়ে এনেছে। নির্বাচনের আগে গত মে মাসে বিভিন্ন রাজ্যে সার্কুলার পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এক হাজারের উপর লোককে
কাউকে মধ্যপ্রদেশ, কাউকে ওড়িশা তো কাউকে রাজস্থানের জেলে ভরা হয়েছে। বাংলা ভাষায় নাকি কথা বলা যাবে না! কে মাছ খাবে, কে মাংস খাবে, কে ডিম খাবে ওরা ঠিক করে দেবে?’ রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, বাংলায় ১৭ লক্ষ রোহিঙ্গা রয়েছে। ওই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তৃণমূল নেত্রী বলেন, ‘বিজেপির এক জন নেতা বলছেন, এখানে নাকি ১৭ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের হিসাব বলছে, বিশ্বে মোট রোহিঙ্গা ১০ থেকে ১২ লক্ষ। আপনি এত জনকে বাংলাতেই বা পেলেন কোথায়?’
