অগ্নিগদ্ধ কলেজছাত্রীর মৃত্যুতে উত্তাল বিধানসভা‌ চত্বর, চলল জলকামান, প্রতিবাদে কাল ওড়িশায় বনধ


দিন দর্পণ, 16 জুলাইঃ ওড়িশার বালাসোরে যৌন হেনস্থার বিচার না পেয়ে গায়ে আগুন দিয়ে কলেজ ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় উত্তাল রাজ্য। বুধবার সকালে ওড়িশা বিধানসভার সামনে জড়ো হয়ে বহু মানুষ বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। বিক্ষুব্ধ জনতাকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যায় পুলিশ। পুলিশের দেওয়া ব্যাডিকেড ভেঙে বিধানসভার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে উত্তেজিত জনতা। পুলিশ বাধা দিলে তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায় বিক্ষোভকারীদের। উত্তেজিত জনতাকে সরাতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। ছোঁড়া হয় কাঁদানে গ্যাস। এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার ওড়িশা বনধের ডাক দিয়েছে কংগ্রেস।‌ যেভাবে কলেজের মধ্যে যৌন হেনস্থার বিচার না পেয়ে এক তরুণী গায়ে আগুন দিয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন, তাতে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি। তিনি বলেন, “দগ্ধে দগ্ধে মৃত্যু হচ্ছে দেশের মেয়েদের। অথচ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নীরব।” এর পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় রাহুল লিখেছেন, “সাহসী কলেজ পড়ুয়া যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ন্যায়বিচারের পরিবর্তে তাঁকে হুমকি, হয়রানি এবং অপমান সহ্য করতে হয়েছে। যাঁদের তাঁকে রক্ষা করার কথা ছিল, তাঁরাই তাঁর মনোবল বারবার ভেঙে দিয়েছেন। প্রতি বারের মতো অভিযুক্তদের রক্ষা করে চলেছে বিজেপি। দেশের এক নিষ্পাপ মেয়ে গায়ে আগুন দিতে বাধ্য হয়েছেন। এটি কোনও আত্মহত্যা নয়, সংগঠিত হত্যা। ওড়িশা হোক বা মণিপুর, দেশের মেয়েদের প্রাণ যাচ্ছে। আর আপনি (প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি) চুপ করে বসে রয়েছেন। কিন্তু দেশবাসী আপনার নীরবতা নয়, এই সমস্ত অপরাধের জবাব চায়।” ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেডি সভাপতি নবীন পট্টনায়েক এদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টে লেখেন, “একটি ব্যর্থ ব্যবস্থা কীভাবে একজনের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে তা ভেবে বিরক্তি লাগছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হল এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়। সাহায্যের পরিবর্তে প্রশাসনিক নীরবতার ফল এই মৃত্যু।”

এই অবস্থায় বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রাজ্য জুড়ে লাগাতার আন্দোলন করতে চাইছে কংগ্রেস। রাহুল গান্ধির নির্দেশে বৃহস্পতিবার ওড়িশা বনধের ডাক দেওয়া হয়েছে। জনসাধারণ যাতে এই কর্মসূচিকে সমর্থন করেন, সেই মর্মে প্রচার চালাচ্ছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। অন্যদিকে বুধবার ৮ ঘণ্টার জন্য বালাসোর বনধের ডাক দিয়েছিল বিজু জনতা দল। তাতে উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া গিয়েছে। এদিন সকাল থেকে পথে নামেন বিজেডি কর্মী সমর্থকরা। রাস্তায় বিক্ষোভ দেখান তাঁরা। টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদে সামিল হন বিজেডি কর্মীরা। বালাসোরে দোকান, বাজার, অফিস বন্ধ ছিল। রাস্তায় যান চলাচল ছিল অত্যন্ত কম।

উল্লেখ্য, বালাসোরের বিএড কলেজের এক বিভাগীয় প্রধান ওই ছাত্রীকে যৌন হেনস্থা করেন বলে অভিযোগ। নির্যাতিতা বিষয়টি নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরলেও তাঁরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করেননি। গত শনিবার ফের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন নির্যাতিতা। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। এরপর প্রবল ক্ষোভে কলেজের মধ্যেই নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন নির্যাতিতা। তাঁর দেহের ৯৫ শতাংশ পুড়ে যায়। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হন অপর এক কলেজ পড়ুয়া। ঘটনার পর নির্যাতিতাকে ভুবনেশ্বর এইমস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে সোমবার রাত পৌনে বারোটায় ওই কলেজ ছাত্রীর মৃত্যু হয়। হাসপাতালের তরফে জানানো হয় কলেজ ছাত্রীকে বাঁচানোর জন্য সব রকম চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁর বৃক্কতন্ত্র প্রতিস্থাপনের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

যৌন হেনস্থার বিষয়টি গত ১ জুলাই কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছিলেন নির্যাতিতা। মাসের পর মাস ধরে ওই বিভাগীয় প্রধান তাঁকে যৌন হেনস্থা করে গিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ সামান্যতম পদক্ষেপ করেনি। এর প্রতিবাদে কলেজ ক্যাম্পাসে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ দেখান নির্যাতিতা এবং তাঁর সহপাঠীরা। এই পরিস্থিতিতে গত শনিবার তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। নিজের গায়ে আগুন দেন তিনি। এরপর ওড়িশা জুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। ঘটনার তদন্তে ওড়িশা পুলিশের অপরাধ দমন শাখা ২ সদস্যের তদন্তকারী দল গঠন করে। পৃথকভাবে তদন্তের নির্দেশ দেয় ওড়িশার উচ্চশিক্ষা দফতর। এরপরই যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত অধ্যাপককে গত শনিবার গ্রেফতার করে পুলিশ। সোমবার গ্রেফতার করা হয় কলেজের অধ্যক্ষকেও। এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনের ঝাঁঝ আরও বাড়াতে চাইছে কংগ্রেস, বিজেডি-সহ বিরোধীরা। বিষয়টি নিয়ে বিজেপি যে তীব্র অস্বস্তিতে পড়েছে, তা স্পষ্ট।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *