বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সংকট নিয়ে এবার উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক মহল


সাহীন আরা সুলতানা

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপর হামলাতে উদ্বিগ্ন ওয়ার্ল্ড মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের চিঠি আবার প্রমাণ করে দিল আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট ঠিক কতটা বিশ্ববাসীর নজর টানছে! এমনিতেই ইউনুস সরকারের, অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে টিকাদানে ব্যর্থতা দেশের শিশুদের উপরে হামের প্রকোপ বাড়িয়েছে কিনা, সেই নিয়ে প্রচন্ডই বিতর্ক রয়েছে| অনেকেই মনে করেন ইউনুসের আমলে যেভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং শিশুদের টিকাদানের বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হয়েছিল, তারই পরিণতি এইভাবে শয়ে শয়ে শিশুর মৃত্যু! আমাদের মতো যাঁরা সামাজিক কর্মী, তাঁরা লাগাতার লিখে গিয়েছি যে বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধবিমান কেনার চাইতে কিংবা সামরিক অস্ত্রশস্ত্র কেনার চাইতে স্বাস্থ্য পরিষেবায় নজর দেওয়া কিংবা শিশুদের টিকাদানের মতো কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়াটা জরুরী ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার চলে যাওয়ার পর,ইউনুস এবং সমন্বয়কদের সরকার যে এই বিষয়টিকে উপেক্ষা করেছিল তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছে| ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের সরকার আসার পরে অনেকেই আশা করেছিলেন যে এবার জামাত বা শিবির নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের বদলে মানুষের স্বার্থে সরকার পরিচালিত হবে| কিন্তু খাস রাজধানী ঢাকায়, বা আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে মিরপুরের একটি টিকাদান কেন্দ্রে যেভাবে ভাঙচুর চালানো হয়েছে তা সকলকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ওই টিকাদান কেন্দ্রে ভাঙচুর যে সরকারের স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে তা ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাকলিন কিৎলুর চিঠি থেকেই পরিষ্কার| ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তরফে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে পরিষ্কার লেখা হয়েছে যে তারা বাংলাদেশে চিকিৎসক, অন্য স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বাস্থ্যপরিসেবার সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের উপর শারীরিক হামলা, হুমকির ঘটনা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন|

সংগঠনটির কাছে অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের কাছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিষেবায় সংকট, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলির উপর হামলার যে সব খবর পৌঁছেছে, তাতে তাদের সাম্প্রতিক ধারণা হয়েছে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং স্বাস্থ্যসেবা খাতে সহিংসতার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার অংশ। ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের চিঠিতে আরও
বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুর পর স্বজনদের মাধ্যমে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণাতেও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মস্থলে সহিংসতার শিকার হওয়া বা সহিংসতার ঘটনা প্রত্যক্ষ করার বিষয়টি উঠে এসেছে।
WMA বলেছে, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর যেকোনো ধরনের সহিংসতা তারা কঠোরভাবে নিন্দা করে। এ ধরনের সহিংসতার ফলে শুধু আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ক্ষতি বা মানসিক আঘাতই হয় না; রোগীদের চিকিৎসার মান, ধারাবাহিকতা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমে এবং ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে থাকা স্বাস্থ্য খাতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে এই ধরনের চাপ তৈরি হলে, তা কিভাবে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ধ্বস নামিয়ে দিতে পারে, তা আমরা সাম্প্রতিক অতীতে দেখেছি| ধর্মীয় মৌলবাদের জন্য হামলা, কোনওরকম প্ররোচনা থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির উপর আক্রমণ, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিগ্রহ আসলেই বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে পঙ্গু করে দিতে পারে|
চিঠিতে WMA-এর “Statement on Workplace Violence in the Health Sector” এবং “Declaration on the Protection and Integrity of Medical Personnel in Armed Conflicts and Other Situations of Violence”-এর উল্লেখ করে বলা হয়, রোগী, চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতি WMA-এর সুপারিশগুলো হলো—

  • চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে সহিংসতা থেকে সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ;
  • স্বাস্থ্যসেবা খাতে সংঘটিত সব হামলার দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা;
  • স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সহিংসতা প্রতিরোধ, রিপোর্টিং ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা;
  • স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর সহিংসতার অন্তর্নিহিত কারণগুলো চিহ্নিত ও মোকাবিলা করা, যার মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলোও রয়েছে।
    WMA বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছে। একই সঙ্গে চিকিৎসা পেশাজীবী ও সংশ্লিষ্ট অন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে পরামর্শ করে বাংলাদেশে সব স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কেন ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল এই চিঠিকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে হবে?কারণ,বিশ্ব চিকিৎসা সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় চিকিৎসা সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক ফেডারেশন। চিকিৎসাবিদ্যার উৎকর্ষ, চিকিৎসা নৈতিকতা ও চিকিৎসকদের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সংস্থাটি আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করে। তারা যে মত প্রকাশ করবে, যে কথা বলবে, তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যতটা আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করবে, তেমনই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বিদেশি সাহায্য আসা বা বিদেশি বিনিয়োগ টানার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করবে|
    বাংলাদেশ, আমাদের যে দেশটি এখনও দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেখানে যদি হাসপাতাল চালাতে গিয়ে মার খেতে হয়, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হন, তাহলে কোন বিদেশি বিনিয়োগ আসবে?

সাহীন আরা সুলতান একজন শিক্ষক, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তার পাশাপাশি অনলাইন এক্টিভিস্ট|


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *