ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক, প্রোপাগাণ্ডা ও বাস্তবতা


সাহিন আরা সুলতানা,
রাজনৈতিক ও সমাজকর্মী

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক এবং ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর ও বহুমাত্রিক। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কিছু মহলে ভারত-বিরোধী বিভিন্ন অপপ্রচার বা প্রোপাগাণ্ডা দেখা গেলেও, বাস্তব চিত্র এবং দুই দেশের মধ্যকার সহযোগিতা সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দেয়।
মিথ্যা তথ্যের প্রচার ও বাস্তব সত্য।

দেশ বিক্রির’ রাজনৈতিক বয়ান ও বাস্তবতার ব্যবধান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিশেষ অপপ্রচার প্রবলভাবে চালানো হয়েছে, যেখানে চরমপন্থী বা উগ্রবাদী কিছু ইসলামী দল এবং গোষ্ঠী অভিযোগ তুলতো যে—তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভারতের কাছে ‘বিক্রি’ করে দিচ্ছেন। ট্রানজিট সুবিধা, সমুদ্রবন্দর ব্যবহার কিংবা সীমান্ত চুক্তি—সরকারের যেকোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা কৌশলগত পদক্ষেপকেই এই দলগুলো ‘দেশ বিক্রির চুক্তি’ হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করতো। তবে রাজনৈতিক মাঠ গরম করার এই জনপ্রিয় বয়ানের সপক্ষে আজ পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠীই কোনো দাপ্তরিক বা বাস্তব প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।

উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো সবসময়ই জনমনে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিতে এই প্রোপাগাণ্ডাকে সস্তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু প্রতিটি চুক্তিই আন্তর্জাতিক আইন এবং দুই দেশের পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করেই সম্পাদিত হয়েছিল। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও, এই ‘দেশ বিক্রির’ দাবির সপক্ষে একটি দলিল বা প্রমাণও কেউ জনসমক্ষে আনতে পারেনি।

বাস্তবে দেখা গেছে, এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রেখেই ভারতের সাথে বাণিজ্য এবং কানেক্টিভিটি বাড়িয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। কোনো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বা সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর করার মতো কোনো ঘটনা কখনোই ঘটেনি।

ঠিক যেভাবে “২৬ লক্ষ ভারতীয় বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করছে” বলে উগ্রপন্থী ও কিছু স্বার্থান্বেষী মহল বছরের পর বছর ধরে জোরালো দাবি করে আসছিল।এই তথ্যের কোনো দাপ্তরিক বা বাস্তব ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কখনোই এ ধরনের কোনো পরিসংখ্যান দেয়নি।
—যা পরবর্তীতে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে—ঠিক একইভাবে ‘দেশ বিক্রির’ এই সুনির্দিষ্ট বয়ানটিও কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশে বৈধভাবে কিছু ভারতীয় আইটি, টেক্সটাইল এবং কর্পোরেট সেক্টরে কাজ করেন, যার সংখ্যা মাত্র কয়েক হাজার। এই বিশাল অংকের ভুল তথ্যটি মূলত দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করার একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগাণ্ডা।

সীমান্তে বিএসএফ-এর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
সীমান্তের বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরির চেষ্টা করা হলেও, সাম্প্রতিক একটি ঘটনা বিএসএফ (সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী) এর মানবিক রূপকে সামনে এনেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মনোহরপুর সীমান্তে পদ্মা নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় ১০ জন বাংলাদেশিকে ডুবে যাওয়া থেকে উদ্ধার করেছে বিএসএফ জওয়ানরা। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিএসএফ সদস্যরা যেভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণ বাঁচিয়েছেন এবং পরবর্তীতে বিজিবির কাছে সসম্মানে হস্তান্তর করেছেন, তা প্রকৃত প্রতিবেশীর দায়িত্বশীল আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশের পাশে সবসময় ভারতঃ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান চিরস্মরণীয়। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধে ভারতের হাজার হাজার সেনা এদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যেকোনো সংকটে ভারত সবসময় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে:
দুর্যোগে সহযোগিতা: বাংলাদেশে যেকোনো বড় বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের পর ভারত সবার আগে মানবিক সহায়তা এবং ত্রাণ সামগ্রী পাঠায়।
ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা: কোভিড-১৯ মহামারীর কঠিন সময়ে ভারত বাংলাদেশকে প্রথম দফায় লাখ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন উপহার হিসেবে দিয়েছিল। এছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে যান এবং ভারত সরকার তাদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে।
বিদ্যুৎ ও বাণিজ্য: বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারত থেকে নিয়মিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে।

মাইলস্টোন স্কুল ট্র্যাজেডি: ভারতের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা
২০২৫ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি ফাইটার জেট বিধ্বস্ত হওয়ার এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বহু শিক্ষার্থী ও বেসামরিক নাগরিক হতাহত হন এবং অগ্নিকাণ্ডের কারণে অনেকে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন।

বাংলাদেশের এই কঠিন সংকটে এবং গভীর শোকের মুহূর্তে ভারত সরকার প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিবেশী হিসেবে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করে। দুর্ঘটনার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।

প্রতিবেশী দেশ পরিবর্তন করা যায় না, আর একটি শান্ত ও সমৃদ্ধ অঞ্চলের জন্য পারস্পরিক বিশ্বাস অত্যন্ত জরুরি। অপপ্রচার সাময়িকভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০ বাংলাদেশিকে বাঁচানোর মতো মানবিক ঘটনা বা ঐতিহাসিক সহযোগিতার যে ভিত্তি, তা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার অটুট বন্ধুত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রোপাগাণ্ডার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের উচিত সঠিক তথ্য যাচাই করা এবং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের গুরুত্বকে অনুধাবন করা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *