দিন দর্পণ, 16 জুলাইঃ দুর্নীতির তদন্ত হবে। তদন্তের জন্য গঠিত হবে একটি কমিটি। সেই তদন্ত কমিটির সদস্যরা দুর্নীতিমুক্ত হবেন। এটাই তো নীতি। কিন্তু দুর্নীতির তদন্তের জন্য গঠিত কমিটিই যদি দুর্নীতিপরায়ন হয় তাহলে আর নীতি’র থাকলো কি?
২০১৩ সালে প্রথম সারদা কেলেঙ্কারির কথা প্রকাশ্যে আসে। সেই কেলেঙ্কারির সীমা রাজ্য পেরিয়ে রাজ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। তার দুর্নীতির তদন্তেই উঠে আসে আরেক চিট ফান্ড রোজভ্যালির কেলেঙ্কারি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ইডি-সিবিআই তদন্তে নামে। সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেন এবং রোজভ্যালির কর্ণধার গৌতম কুণ্ডুদের গ্রেফতার করে। রোজভ্যালি-সারদার সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হয়। আমানতকারীদের টাকা ফেরতের জন্য কAdvertiseমিটি গঠন করা হয়। তবে বিভিন্ন চিটফান্ডে রাখা টাকা এখনও ফেরত পাননি বহু আমানতকারী।
এরই মধ্যে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে রোজভ্যালির জন্য গঠিত তদন্ত কমিটির কাজ নিয়ে। রোজভ্যালির আমানতকারীদের টাকা ফেরাতে গঠিত কমিটিই নাকি গত ১০ বছর কোনও অডিট করেনি! চিটফান্ডের তদন্তে গঠিক কমিটিই এবার তদন্তের আতস কাচের তলায়! তার মানে কি এখানেও সর্ষের মধ্যে ভূত রয়েছে?
রোজভ্যালিতে টাকা রেখেছিলেন প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ। আর তাঁদের মোট আমানতের অঙ্কটা ছিল প্রায় তিন হাজার কোটির মতো। রোজভ্যালির যে সম্পত্তি ইডি বাজেয়াপ্ত করেছে, তার পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকার মতো। আর নগদ রয়েছে ৮০০ কোটি।
আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর জন্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি দিলীপ শেঠের নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছিল একটি কমিশন। প্রতারিতদের হাতে টাকা তুলে দিতে, প্রথম দফায় ১৯ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা ‘অ্যাসেট ডিসপোজাল কমিটি’কে দিয়েছিল ইডি। কারণ চিটফান্ডের বাজেয়াপ্ত টাকা জমা থাকে ইডির অ্যাকাউন্টেই। টাকা ফেরতের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ২৮ লক্ষ ১০ হাজার ৭১৪টি। তথ্য যাচাইয়ের পর প্রথম দফায় ৭ হাজার ৩৪৬ জন আমানতকারীকে তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছিল। পরে মোট পাঁচ দফায় ৩২,৩১৯ জন বিনিয়োগকারীকে ২১ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ফেরত দিয়েছে অ্যাসেট ডিসপোজাল কমিটি। এখনও পর্যন্ত ইডি-র তদন্ত ও অনুসন্ধান যত দূর এগিয়েছে, সেই অনুসারে তাদের অনুমান, রোজভ্যালিতে টাকা রেখে বিপদে পড়েছেন, এমন প্রায় ৩১ লক্ষ বিনিয়োগকারী তাঁদের টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন জমা করেছেন।
রোজভ্যালির আমানতকারীদের টাকা ফেরাতে গঠিত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি দিলীপ শেঠ কমিটির কাজকর্ম নিয়ে অনুসন্ধান কমিটি বসানোর ইঙ্গিত দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। হাইকোর্টের নির্দেশে রোজভ্যালির ওই কমিটি মঙ্গলবার তাদের কাজকর্ম, আর্থিক হিসাব সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট দেয়। সেখানে আদালতের নজরে আসে, গত ১০ বছরের আর্থিক হিসাবে কোনও অডিট হয়নি! এরপরেই আদালতের নজরে পড়ে, বিচারপতি শেঠ কমিটি ২০১৫ সাল থেকে এত দিনে মাত্র ১০ লক্ষ টাকা অফিস চালাতে খরচ করেছে। আর চেয়ারম্যানের বেতন দিয়েছে ‘চকোলেট গ্রুপ’ নামে একটি কোম্পানি! আশ্চর্যের বিষয় হল, হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও রোজভ্যালির হোটেলগুলো বিক্রি না করে, আমানত কারীদের টাকা না মিটিয়ে, ওই কমিটি চকোলেট গ্রুপকে দিয়ে তার ব্যবসা করিয়েছে! আরও উদ্বেগের বিষয় যেটি আদালতের নজরে পড়েছে সেটা হল, এই চকোলেট গ্রুপের কোনও অস্তিত্বই নেই। অস্তিত্বহীন একটা কোম্পানিকে কমিটির মধ্যে ঢুকিয়ে কি ফের জালিয়াতি হয়েছে? এটা কি তাহলে ভাবের ঘরে ঘুঘুর বাসা? হতবাক বিচারপতি এই তদন্ত কমিটির কাজকর্ম পরীক্ষার জন্য অনুসন্ধান কমিটি গঠনের কথা ভাবছেন!
