জীবনটা দেশের নামে লিখে দিলে ভালো হয় :কর্ণেল সোফিয়া কুরেশি


দিন দর্পণ, কলকাতা, 10 মে, 2025: কর্নেল সোফিয়া কুরেশি এই মুহুর্তে চর্চার অন্যতম নাম। সোফিয়া দেশের গর্ব। পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হানায় যাঁদের সিঁথির সিঁদুর মুছেছে তার বদলা নিতে অগ্রণী ভারতীয় সেনাদের মধ্যে যাঁর নাম বেশি বেশি করে উচ্চারিত হচ্ছে তিনি হলেন কর্নেল সোফিয়া কুরেশি। ভারতীয় নারী শক্তির জ্বলন্ত প্রমাণ কর্নেল সোফিয়া কুরেশি। ভারতীয় সেনা বাহিনীতে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারা কতটা অংশগ্রহণ করছেন তার প্রমাণ দিয়েছেন কর্নেল সোফিয়া কুরেশি এবং উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিং’রা। সারা দেশ আজ তাঁদের কুর্নিশ জানাচ্ছে।

কর্নেল সোফিয়া কুরেশি আমাদের দেশের গর্ব। চার বছর আগে কোভিডকালে আমাদের অনলাইন কেরিয়ার কাউন্সেলিং গাইডে এসে যেভাবে সকলকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন তা আমরা চিরকাল মনে রাখবো।—পি বি সেলিম

এ দিকে সোফিয়া কুরেশিকে কলকাতায় বাড়তি উন্মাদনা রয়েছে। কারণ কর্নেল সোফিয়া তাঁর কর্মজীবনের একটা সময় কাটিয়ে গেছেন এই কলকাতায়। কোভিডকালে সোফিয়া কুরেশি পোস্টিং ছিলেন কলকাতার ফোর্টইউলিয়ামে। সালটা ছিল ২০২০। সেই সময় স্কুল, কলেজ তো দূর অস্ত, কেউ যখন বাড়ির বাইরে বের হওয়ার কথা ভাবতেই পারছিলেন না তখন পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ভারতীয় সেনার যোগদানে কম্বাইন্ড কোর্সে পরীক্ষায় বসতে হলে কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে বাংলার যুবক যুবতীদের তারজন্য অনলাইন ক্লাস চালু করেছিলেন তৎকালিন চেয়ারম্যান পি বি সেলিম। সেলিম সাহেব চেয়েছিলেন, ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও যাতে সেনা বাহিনীতে বেশি করে যোগদানের সুযোগ পান। পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম ভারতীয় সেনায় যোগদানে কম্বাইন্ড ডিফেন্স সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসাবে অনলাইন ক্লাস হিসাবে ৯৯টি পর্ব সম্পন্ন করেছিল। আর এরমধ্যে একটি পর্বে পড়ুয়াদের বিশেষ করে ছাত্রীদের সেনায় যোগদানে উৎসাহ দিয়েছিলেন এই কর্নেল সোফিয়া কুরেশি। আজ ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানে তাঁর অংশগ্রহণের খবরে খুশি পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু দফতরের সচিব পি বি সেলিম। তিনি বলেন, কর্নেল সোফিয়া কুরেশি আমাদের দেশের গর্ব। চার বছর আগে কোভিডকালে আমাদের অনলাইন কেরিয়ার কাউন্সেলিং চালু হয়েছিল। সেই প্রোগ্রামে আমরা রাজ্যের বাইরের বহু বিশিষ্ট লোকজনকে আনতে পেরেছিলাম। তার মধ্যে একটা ওয়েবিনার কনডাক্ট করেছিলেন কর্নেল সোফিয়া কুরেশি। সে সময়ে তিনি কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে পোস্টেড ছিলেন। তিনি সিডিএস পরীক্ষা ক্র্যাক করা এবং আর্মিতে যোগ দেওয়া নিয়ে কথা বলেছিলেন বাংলার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। বিশেষ করে মেয়েরা কীভাবে যোগ দিতে পারে আর্মিতে, যেহেতু মেয়েদের অংশগ্রহণ এতে কম, তা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছিলেন তিনি। কীভাবে আর্মির কমিশনার বা অফিসার র‌্যাঙ্কে যোগ দেওয়া যায়, তা নিয়েও কথা হয়েছিল। অনেকেই উপকৃত হয়েছিল, সেনায় যোগ দেওয়ার অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছিল ওই প্রোগ্রাম দেখে।’

সেদিনকার সেই কেরিয়ার কাউন্সেলিংয়ের ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের চেয়ারম্যান পি বি সেলিম। সেখানে সোফিয়াকে স্পষ্ট বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘জীবন একটাই, সেটা দেশের নামে লিখে দিতে পারলে ভালো হয়।’

সোফিয়া কুরেশি ভারতের গুজরাত রাজ্যের বাসিন্দা। বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে এমএ পাস সোফিয়া প্রথম ভেবেছিলেন বিজ্ঞানী হবেন। কিন্তু মেয়েদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের অপশান খুলে দিতেই তিনি পারিবারিক ধারাবাহিকতা মেনে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৯৯ সালে অফিসার্স ট্রেনিং অ্যাকাডেমি থেকে উত্তীর্ণ হন তিনি। কাউন্টার ইনসার্জেন্সিসহ বহু অভিযানে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সোফিয়ার পরিবারের সম্পর্ক বহুদিনের। সোফিয়ার দাদা ও বাবা দু’জনেই সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। সোফিয়ার স্বামীও সেনা কর্মকর্তা। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রি অফিসার।

কর্নেল সোফিয়া কুরেশি ছিলেন সেই ১১ জন মহিলা অফিসারের মধ্যে একজন যাদের কৃতিত্ব সুপ্রিম কোর্ট ২০২০ সালে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পদে লিঙ্গ সমতা সংক্রান্ত তার ঐতিহাসিক রায়ে তুলে ধরেছিল।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২০ সালে এক বার্তায় সোফিয়া সম্পর্কে জানিয়েছিল, সোফিয়া ১৯৯৯ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৯৯ সালে তিনি চেন্নাইয়ের অফিসার্স ট্রেনিং একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর সোফিয়া সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। ২০০৬ সালে সোফিয়া কঙ্গোতে রাষ্ট্রসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০১০ সাল থেকে শান্তিরক্ষা অভিযানের সাথে যুক্ত। পঞ্জাব সীমান্তে অপারেশন পরাক্রমের সময় তার সেবার জন্য তিনি জেনারেল অফিসার কমান্ডিং-ইন-চিফ (জিওসি-ইন-সি) থেকে একটি প্রশংসাপত্রও পেয়েছেন।

২০১৬ সালে তিনি ১৮টি দেশের উপস্থিতিতে সামরিক মহড়া ‘এক্সারসাইজ ফোর্স ১৮’এ ৪০ সদস্যের ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার সেনা কর্মকর্তা। বহুজাতিক মহড়ার ভারতীয় দলের নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম নারী কর্মকর্তা তিনিই।

মহারাষ্ট্রের পুনেতে অনুষ্ঠিত সেই মহড়ায় অংশ নিয়েছিল চিন, জাপান, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ। সেই মহড়ায় অন্য কোনো দেশের নেতৃত্বে কোনো নারী ছিলেন না।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *