চিরবিদায় ডঃ মনমোহন সিং(১৯৩২-২০২৪)


দিন দর্পণ, ২৭শে ডিসেম্বরঃ প্রয়াত হলেন ভারতের ১৩ তম প্রধান মন্ত্রী।৯২ বছরে দিল্লির এইমস হাসপাতালে বৃহস্পতিবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।ওইদিন সন্ধ্যায় তাঁকে দিল্লির এইমস-এ নিয়ে যাওয়া হয় শ্বাস কষ্টের কারণে।হাসপাতালের সূত্রে জানা যায়, বয়সজনিত অসুখে ভুগছিলেন মনমোহন।এদিন বাড়িতেই আচমকা অজ্ঞান হয়ে যান।তাঁকে দ্রুত এইমসের এমারজেন্সি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়।রাত ৯টা ৫১ মিনিটে জানিয়ে দেওয়া হয় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ।

মনমোহন সিং-এর শেষকৃত্য

কংগ্রেসের তরফে জানানো হয়েছে, ২৮ ডিসেম্বর অর্থাৎ শনিবার রাজঘাটে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে মনমোহনের।শুক্রবার সকালে মতিলাল নেহরু মার্গের বাসভবনে নিয়ে আসা হয়েছে মনমোহন সিংয়ের মৃতদেহ।সেখানে গিয়ে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা।কংগ্রেস সূত্রে খবর, শনিবার দলীয় সদর দফতরে নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর মরদেহকে।সেখানে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পরই পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাজঘাটে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।মনমোহনের ছোট মেয়ে ক্যালিফর্নিয়ায় স্ট্যানফোর্ড ল স্কুলের অধ্যাপক।সেখান থেকে তিনি শুক্রবার বিকেলে দেশে ফিরবেন।সেই কারণেই শেষকৃত্য হবে শনিবার।তারপর তাঁর অস্থি কংগ্রেস সদর দফতরে নিয়ে যাওয়া হবে।সাধারণ মানুষও সেখানে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন।

মনমোহনের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ রাজনৈতিক মহল

তাঁর প্রয়াণে কংগ্রেস সাত দিনের জন্য সব দলীয় কর্মসূচি বাতিল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।কর্নাটক সরকার ইতিমধ্যে সাত দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে।কর্নাটক মুখ্যমন্ত্রীর দফতরকে উদ্ধৃত করে সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, শুক্রবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে সে রাজ্যের সরকার।কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কেসি বেনুগোপাল সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, দলের সমস্ত কর্মসূচি সাত দিনের জন্য বন্ধ রাখা হচ্ছে।দলের প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপনও সেই মতো এ বছর বাতিল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।এই সাত দিন সর্বত্র দলের পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।৩ জানুয়ারি থেকে দলীয় কর্মসূচি পুনরায় চালু হবে।

গতকাল মনমোহন সিং-এর হাসপাতালে ভর্তির খবর পেয়ে কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গান্ধি দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায়।তাঁর প্রায়াণের খবর পেয়ে প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সোশ্যাল মিডিয়ার এক্স হ্যান্ডেলে শোক প্রকাশ করেন।বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধি, রাহুল গান্ধি, অভিষেক ব্যানার্জি।তাঁর প্রয়াণে বার্তা দিয়েছেন এই দেশগুলির প্রাক্তন রাষ্ট্রনেতারা।

মনমোহন সিং-কে প্রতিবেশী দেশের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন

আফগানিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে লিখেছেন, ভারত তাঁদের অন্যতম এক মহান ছেলেকে হারাল।মনমোহন সিং আফগানিস্তানের এক প্রকৃত বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন।তাঁর প্রয়াণের খবর আমাকে গভীর শোক দিয়েছে।মালদ্বীপের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মহম্মদ নাসিদ বলছেন, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মালদ্বীপের এক ভীষণ ভাল বন্ধু ছিলেন এবং আমার কাছে পিতাসম।তাঁর সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমি খুবই কৃতজ্ঞ।ভারতে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপবের বক্তব্য, দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও ভাল করার ক্ষেত্রে মনমোহন সিংয়ের অবদান ভোলা যায় না।তিনি চলে যাওয়া ভারতের জন্য এক বিরাট ক্ষতি।অর্থনীতিতে তাঁর অবদান ভারতকে অনেকদূর নিয়ে এসেছে।

মনমোহন সিং-এর শৈশব

মনমোহন সিং ব্রিটিশ ভারতে পাঞ্জাবের গাহ ১৯৩২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এক শিখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তাঁর পিতা গুরুমুখ সিং এবং মাতা অমৃত কৌর।ভারত ভাগের পর তিনি অমৃতসরে চলে আসেন শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি বরাবরই প্রথম স্থান অধিকার করেছেন এবং ১৯৫২ ও ১৯৫৪ সালে চন্ডিগড়ের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে যথাক্রমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী পান।অর্থনীতিতে সন্মানিক স্নাতক ডিগ্রীর লাভের জন্য তিনি সেন্ট জন্স মহাবিদ্যালয়ের একজন সদস্য হিসাবে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে যান।ন্যুফিল্ড মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে তিনি ১৯৬২ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে ডক্টরেট উপাধিধারীডিগ্রী অর্জন করেন।তাঁর গবেষণা পত্রের বিষয় ছিল ১৯৫১ থেকে ১৯৬০ এই সময় কালে রপ্তানি বাণিজ্যে ভারতের ভূমিকা, রপ্তানি বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ ও নীতির বৈশিষ্ট সমূহ” এবং গবেষণা পত্রের পরিদর্শক ছিলেন ডক্টর আই এম ডি লিটল।এই গবেষণা পত্রের ভিত্তিতেই তিনি “ইন্দিযাস এক্সপোর্ট ট্রেন্ডস এন্ড প্রসপেক্টস ফর সেল্ফ-সাস্তেন্দ গ্রোথ” নামে একটি পুস্তক রচনা করেন।

অর্থমন্ত্রী হিসাবে তাঁর সাফল্য

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, পি ভি নরসিমহা রাও শ্রী সিং কে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী হিসাবে মনোনীত করেন।সেই সময় ভারত বর্ষ এক অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন ছিল সেখান থেকে তিনিই রাও এবং সিং সেই সময় ভারতীয় অর্থনীতিকে সমাজবাদী অর্থনীতি থেকে মুক্ত পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে পরিবর্তিত করার সিদ্ধান্ত নেন।স্বাধীনতার পর প্রথমবার তাঁর হাতেই ভারতীয় অর্থনীতি আমূল বদলে যায়।বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় তলানিতে।দায়িত্ব নিয়েই বিশ্বের দরবারে ভারতীয় অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করে দিলেন মনমোহন সিং।তাঁর হাত ধরেই উদার অর্থনীতির ছোঁয়া লাগল দেশে।

দীর্ঘ ১০ বছরের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সাফল্য

২০০৪ সালের ২২শে মে থেকে ২০১৪ সালের ২৬শে মে পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন।ভারতের প্রথম শিখ প্রধান মন্ত্রী মনমোহন সিং।তাঁর নেতৃত্বে একাধিক সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগ নিয়েছে ইউপিএ সরকার।তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বেই সরাসরি নগদ স্থানান্তর, আধার-এর মতো সংস্কারমূলক কার্যক্রম চালু হয়েছিল।তাঁর প্রধান মন্ত্রী থাকার সময়কালে বেশ কিছু কাজ করেছেন।যেগুলির মধ্যে অন্যতম জাতীয় গ্রামীণ রোজকার গ্যারান্টি আইন।২০০৫ সালে মনমোহনের আনা এই আইন আজ গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।২০০৮ সালে বাস্তবায়িত হওয়া ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি শুধু যে ভারতের শক্তির চাহিদা পূরণ করেছে তাই নয়, একই সঙ্গে আমেরিকা এবং পশ্চিমী দুনিয়ার সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বের পথ খুলে দিয়েছে।যা বর্তমান ভূরাজনীতিতে ভারতের দাপটের ভিত্তি।২০০৫ সালে পাস হয় ঐতিহাসিক আরটিআই আইন।এই আইনের আওতায় সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকার পায় আমজনতা।তাঁর আমলেই প্রথমবার দেশের আর্থিক বৃদ্ধি দুই সংখ্যা পেরোয়।২০০৬-২০০৭ সালেই দেশের GDP বৃদ্ধির হার ১০.০৮ শতাংশের মাত্রা ছোঁয়।২০১৩ সালের জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের সূচনা করে মনমোহন সরকার।দেশের প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে ভর্তুকিপ্রাপ্ত খাদ্যশস্য পৌঁছে দেওয়ার আওতায় আনা হয়।স্কুলের মিড ডে মিল, ICDC,  PDC, সবকিছু খাদ্য সুরক্ষার আওতায় আসে।২০০৭ সালে মনমোহন আমলেই দেশের অর্থনীতি ১ লক্ষ কোটি ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে।বিশ্বের তাবড় দেশের তালিকায় নাম তোলে ভারত।২০০৪ সালের দেশে দারিদ্রের হার যেখানে ৩৭.২ শতাংশ ছিল।৮ বছর পরে ২০১২ সালে তা ২১.৯ শতাংশে এসে ঠেকে। মাত্র ৮ বছরে ১৫ শতাংশের বেশি দারিদ্র কমান মনমোহন।২০১২ সালে মাল্টি ব্র্যান্ড রিটেলে ৫১ শতাংশ এবং সিঙ্গল ব্র্যান্ড রিটেলে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে অনুমোদন।প্রথম ইউপিএ সরকারের অন্যতম জনমোহিনী সিদ্ধান্ত প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ মকুব। ইউপিএ সরকারের আমলে মিড ডে মিল প্রকল্পকে ঢেলে সাজানো হয়।প্রথমবার দেশের সব সরকারি স্কুলে চালু করা হয়। ব্যাপক বিনিয়োগ করে কেন্দ্র।বাজপেয়ী আমলের সোনালি চতুর্ভুজ প্রকল্প সম্পন্ন করতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে মনমোহন সরকার। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্পেশ্যাল ইকনোমিক জোন গড়ে বিনিয়োগের পথ সুগম করা হয়।যে আধার কার্ড আজকাল প্রায় সমস্ত সরকারি প্রকল্পে বাধ্যতামূলক, সেটা শুরু হয় মনমোহনের আমলে। ২০০৯ সালের ২৮ জানুয়ারি ভারতীয়দের অভিন্ন পরিচয়পত্র তৈরির উদ্দশে আধার কার্ডের সূচনা হয়।তাঁর আমলে মহাকাশ গবেষণা নতুন দিশা পায়। ২০০৮ সালে দেশের প্রথম চন্দ্রযানের উৎক্ষেপণ। ২০১৩ সালে মঙ্গলযানের উৎক্ষেপণও হয় মনমোহনের আমলেই।মনমোহন সিংয়ের আমলে ২০১২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভারতকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ সরকারকে শুদ্ধ করতে ২০১৩ সালে লোকপাল আইন তৈরি করেন মনমোহন। ক্ষমতাসীন নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য জনলোকপাল প্রতিষ্ঠা করা হয়।    


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *